দূরত্বটা কি শুধু মাইলের? নাকি মনোভঙ্গির?
ভেবেছিলাম শহর বদলালে আকাশ বদলায়, কিন্তু মানুষের উদাসীনতা যে এতটা প্রকট হতে পারে, তা এই হরমোনাল ঝড়ের রাতে টের পেলাম। আমার এখানে যখন রাত বারোটা পেরিয়ে একাকীত্বের চরম সীমায়, ডাক্তার যখন বলে দিয়েছেন— "বিশ্রাম, অন্তত ছয় মাস। নড়াচড়া নিষেধ"— তখন তোমার শহরে ঘড়ির কাঁটা রাত ন’টার ঘরে। মাত্র তিন ঘণ্টার ব্যবধান। অথচ মনে হয়, আলোকবর্ষ দূর থেকে তোমার টেক্সট আসে, তাও মাঝরাতে, যখন আমার ব্যথারা ঘুমিয়ে পড়ার ভান করে।
আমি শুনেছি, ভালোবাসা নাকি মানুষকে সেবাই করে তোলে।
অথচ আমি যখন দু-দুবার রক্তমাখা শরীর নিয়ে রাস্তার ধুলোয় পড়ে ছিলাম— দুর্ঘটনার সাক্ষী হয়ে— তখনো
তোমার ব্যস্ততার অজুহাত ফুরোয়নি। একবারও কি মনে হয়নি— মানুষটা বেঁচে আছে তো? নাকি ওই ‘সরি’ শব্দটা
তোমার অভিধানে নেই? অদ্ভুত তোমার আত্মপক্ষ সমর্থন! যেন আমার বেঁচে থাকাটাই তোমার কাছে এক মস্ত বড়
বোঝার মতো।
ভিক্ষুকের মতো ভালোবাসা চাওয়ার গ্লানি কি, তুমি জানো?
প্রতিবার যখন আমি একটু উষ্ণতা চেয়েছি, একটু "আছি" শোনার জন্য কাঙাল হয়েছি, তুমি দাঁড় করিয়ে দিয়েছ
যুক্তির পাহাড়। যেন ভালোবাসা কোনো মামলার শুনানি, আর তুমি সেখানেও নিজের নির্দোষিতা প্রমাণে ব্যস্ত।
ভালোবাসা যে অধিকার নয়, বরং স্বতঃস্ফূর্ত দান— এই সহজ সত্যটা তোমাকে বোঝাতে গিয়ে আমি নিজেই ক্লান্ত
হয়ে পড়েছি।
আচ্ছা, বিমানের টিকিট কাটতে কি খুব বেশি সময় লাগে?
শুনেছি বন্ধুদের জন্য তুমি আকাশ কিনতে পারো। তাদের বিমানের টিকিটের দাম তোমার কাছে নস্যি। অথচ, আমার সামান্য স্পটিফাই সাবস্ক্রিপশন— যেটা হয়তো আমাদের দূরত্বের মাঝে একটু সুরের সেতু হতে পারত— সেটা রিনিউ করার সময় তোমার কার্ড অচল হয়ে যায়? পেমেন্ট বাতিল করে দিয়ে তুমি বুঝিয়ে দাও, আমার সুরের চেয়ে বন্ধুদের উড়ান তোমার কাছে অনেক বেশি দামী।
টাকা নয় গো, প্রায়োরটি।
যেখানে আমাকে ভালো রাখার জন্য এক পয়সা খরচ করতেও তোমার হাত কাঁপে, সেখানে বন্ধুদের জন্য তোমার
উদারতা আমাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়— আমি তোমার কে? বা কে ছিলাম?
আজ এই অসুস্থ শরীরে, বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবি—
অপরাধটা আসলে কার? তোমার? না। তুমি তো কখনো ভালোবাসোইনি। অভিনয় করেছ, অজুহাত দিয়েছ। অপরাধী আমি। যে
জেনেবুঝেও, তোমার অবহেলার ক্যাকটাসে জল ঢেলে গেছি, আর ভেবেছি— একদিন সেখানে গোলাপ ফুটবে।
তুমি নির্দোষ থাকো।
তোমার বন্ধুদের নিয়ে আকাশে ওড়ো।
আমার স্পটিফাই নাহয় স্তব্ধই থাক।
শুধু জেনে রেখো, এই যে ছয় মাসের স্থবিরতা— এটা আমার শরীরের অসুখ হতে পারে, কিন্তু তোমার আত্মার যে
অসুখ— তার চিকিৎসা কোনো ডাক্তারের কাছে নেই।
কাঠগড়ায় যখন তুমি, তখনো কি নিজেকে নির্দোষ বলবে?
জানো, মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে করে, তোমাকে একদিন আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিই। না, সেই আয়না নয় যাতে তুমি তোমার নিখুঁত মেকআপ আর সাজানো হাসি দেখো। আমি বলছি বিবেকের আয়নার কথা। যদিও সন্দেহ হয়, তোমার আদৌ কোনো বিবেক আছে কি না। থাকলে, সেটা হয়তো মরে গেছে বহুদিন আগেই— অবহেলার ধুলোয়, অজুহাতের আবর্জনায়।
আজ যখন ডাক্তার আমাকে বিছানায় বেঁধে রেখেছেন, যখন নড়াচড়া করা বারণ, যখন শরীরের হরমোনগুলো বিদ্রোহ করছে— তখন মনে পড়ে সেই রাতগুলোর কথা। ঘড়িতে তখন বারোটা বাজে। আমার শহরের নিস্তব্ধতা গ্রাস করছে আমাকে। আমি অপেক্ষায় থাকি। একটা টুং টাং শব্দের অপেক্ষায়। একটা মেসেজ। "কেমন আছো?" কিংবা "শরীরটা কি আজ একটু ভালো?"
নাহ, সেই শব্দ আসে না।
অথচ তোমার শহরে তখন সবে রাত নয়টা। ডিনারের প্রস্তুতি চলছে হয়তো। কিংবা ল্যাপটপের আলোয় উজ্জ্বল তোমার মুখ। বন্ধুদের সাথে চ্যাট বক্সে হাসির ফোয়ারা ছুটছে। আমার এই অসুস্থতা, এই মৃত্যুভয়, এই একাকীত্ব— এগুলো তোমার কাছে তুচ্ছ। তোমার কাছে রাত বারোটা মানে "লেট নাইট", কিন্তু আমার কাছে সেটা যন্ত্রণার শুরু। তুমি বলো, "আমি তো অসুস্থ, তাই একটু আগে শুয়ে পড়েছিলাম।" কিংবা "কাজ ছিল খুব।"
ছিঃ! এই মিথ্যেগুলো বলতে তোমার জিভ আটকায় না? ভালোবাসা থাকলে মানুষ মৃত্যুশয্যা থেকেও খবরাখবর নেয়। আর তুমি? তুমি তো সুস্থ। তোমার একমাত্র অসুস্থতা হলো— স্বার্থপরতা। তুমি হয়তো ভাবো, রাত বারোটার পর একটা মেসেজ দিলেই দায়িত্ব শেষ। যেন ভিক্ষুককে একমুঠো চাল ফেলার মতো। কিন্তু ওই একমুঠোর চালে যে আমার খিদে মেটে না, সেটা বোঝার ক্ষমতা তোমার মস্তিষ্কের নেই, হৃদয়ের তো নেই-ই।
ছয় মাস! ডাক্তার বলেছে ছয় মাস।
তুমি কি জানো, ছয় মাস কতগুলো দিন? কতগুলো ঘণ্টা? কতগুলো সেকেন্ড? এই দীর্ঘ সময়টা আমাকে কাটাতে হবে ছাদের দিকে তাকিয়ে। আর তুমি? তুমি ব্যস্ত থাকবে তোমার বন্ধুদের ফ্লাইট শিডিউল মেলাতে। তোমার ক্যালেন্ডারে বন্ধুদের জন্মদিনের দাগ কাটা আছে লাল কালিতে, তাদের সাথে ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান আছে। কিন্তু আমার অসুস্থতা? ওটা তো ক্যালেন্ডারের পাতায় ধরে না। ওটা তো শুধুই একটা "খারাপ খবর", যা শুনে দু'সেকেন্ডের জন্য "ওহ, সো স্যাড" বলা যায়, তারপরই ভুলে যাওয়া যায়।
তোমার কি মনে পড়ে সেই দুবারের দুর্ঘটনার কথা?
রক্তে ভেসে যাচ্ছে শরীর। রাস্তায় পড়ে আছি। লোকে ভিড় করছে। অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন। আর আমার ঝাপসা চোখে শুধু তোমার মুখটা ভাসছে। হাসপাতালে জ্ঞান ফেরার পর প্রথম ফোনটা তোমাকেই করেছিলাম। আশা করেছিলাম, ওপাশ থেকে কান্নাভেজা গলায় শুনবো, "আমি এখনই আসছি।" কিংবা অন্তত, "তুমি ঠিক আছো তো? কোত্থেকে রক্ত পড়ছে?"
কিন্তু না। তুমি তখন ব্যস্ত ছিলে। কিসে ব্যস্ত? বন্ধুদের আড্ডায়? নাকি শপিংয়ে? নাকি নিজের ক্যারিয়ার গোছাতে? তোমার ঠান্ডা গলায় উত্তর এসেছিল, "সাবধানে চলতে পারো না? এখন আমি কি করবো? আমি তো দূরে।"
দূরে!
শারীরিক দূরত্ব কি সত্যিই এত বড় বাধা? মনটা যদি পড়ে থাকত আমার হাসপাতালের বেডে, তবে কি তুমি অতটা শান্ত থাকতে পারতে? আমার তো মনে হয়, আমি যদি মরেও যেতাম, তুমি হয়তো ফেসবুকে একটা শোকবার্তা লিখেই দায় সারতে। "Rest in Peace" লেখার পর হয়তো বন্ধুদের সাথে সেলফি আপলোড করতে। কারণ তোমার কাছে শোকের চেয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার স্ট্যাটাস বেশি দামী।
আমার শরীরের ব্যথার চেয়েও বেশি ব্যথা লেগেছিল তোমার ওই শান্ত কণ্ঠে। মনে হয়েছিল, এর চেয়ে ওই ট্রাকটা আমাকে পিষে মেরে ফেললেই ভালো হতো। অন্তত তোমার এই নিষ্ঠুর রূপটা দেখতে হতো না।
"ভালোবাসা যেখানে মৃত, সেখানে অধিকার ফলানো চলে না—
শুধু লাশের ময়নাতদন্ত করা যায়, কেন সে মরল।"
টাকার কথায় আসি। ছিঃ, ভালোবাসার সাথে টাকার তুলনা করতে আমার নিজেরই ঘৃণা হচ্ছে। কিন্তু তুমি আমাকে বাধ্য করেছো।
আমি গান শুনতে ভালোবাসি, সেটা তুমি জানতে। স্পটিফাই-এর সাবস্ক্রিপশনটা ছিল আমার ওই একরত্তি ভালো থাকার রসদ। তুমি দায়িত্ব নিয়েছিলে। বলেছিলে, "এটা আমি দেখবো।" আমি বিশ্বাস করেছিলাম। কিন্তু তারপর? হুট করে একদিন গান বন্ধ হয়ে গেল। তুমি পেমেন্ট বাতিল করে দিলে। কারণ? কারণ হিসেবে যা দেখালে, তা এতটাই হাস্যকর যে শুনলে মরা মানুষও হাসবে।
অথচ, সেই একই সপ্তাহে, তুমি তোমার বন্ধুর বিমানের টিকিট স্পন্সর করলে। হাজার হাজার টাকা উড়লে এক নিমিষে। সেখানে তোমার হাত কাঁপল না? সেখানে তোমার কার্ড ডিক্লাইন হলো না?
অংকটা খুব সোজা, জানো?
আমার জন্য ১০০ টাকা খরচ করা মানে তোমার কাছে অপচয়। আর বন্ধুদের জন্য টাকা খরচ করা মানে তোমার কাছে ইনভেস্টমেন্ট, কিংবা স্ট্যাটাস সিম্বল। আমি তোমার স্ট্যাটাস বাড়াই না, তাই না? আমি তো শুধুই সেই বোকা প্রেমিক, যে একপাক্ষিক ভালোবাসা দিয়ে তোমাকে দেবীর আসনে বসিয়েছিল। আর তুমি সেই আসনের ওপর দাঁড়িয়ে আমাকেই লাথি মেরেছ।
তুমি কি কখনো "সরি" বলেছো? মন থেকে?
প্রতিবার আমি যখন অভিযোগ করেছি, তুমি উল্টো আমাকে দোষী বানিয়েছো। এটা তোমার এক অদ্ভুত প্রতিভা। আমি বলি, "তুমি খোঁজ নাওনি কেন?" তুমি বলো, "আমি ব্যস্ত ছিলাম, তুমি কেন বোঝো না আমার লাইফটা?" আমি বলি, "তোমার কথাগুলো আমাকে কষ্ট দিয়েছে।" তুমি বলো, "তুমি বেশি সেনসিটিভ, সব কিছুতে ওভাররিয়্যাক্ট করো।"
বাহ! কী চমৎকার ডিফেন্স মেকানিজম! কাঠগড়ায় আমি দাঁড়ালাম বিচার চাইতে, আর তুমি বিচারক হয়ে আমাকেই চোরের অপবাদ দিয়ে দিলে। তোমার এই ম্যানিপুলেশন আর্ট দেখে আমি মুগ্ধ। সত্যি, এমন নিখুঁতভাবে কেউ খুন করতে পারে, রক্ত না ঝরিয়ে, তা তোমাকে না দেখলে বিশ্বাস হতো না।
তুমি তো নিজেকে খুব প্র্যাকটিক্যাল দাবি করো। বলো, "ইমোশন দিয়ে জীবন চলে না।" ঠিক। ইমোশন দিয়ে জীবন চলে না, কিন্তু ইমোশন ছাড়া মানুষ আর পাথরের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে কি? তুমি তো পাথর হয়ে গেছো। চকচকে, মসৃণ, কিন্তু ভেতরে প্রাণহীন একটা পাথর।
আমার এই হরমোনাল সমস্যা, এই যে শরীরের ভেতর তোলপাড়— ডাক্তাররা ওষুধ দেন, টেস্ট করান। তারা রিপোর্ট দেখেন। কিন্তু তারা কি দেখতে পান, আমার বুকের ভেতরের রক্তক্ষরণ? তারা কি জানেন, এই রোগের অর্ধেক কারণ তুমি? তোমার দেওয়া মানসিক চাপ, তোমার অবহেলা, তোমার দিনের পর দিন চুপ করে থাকা— এসবই তো বিষ হয়ে জমেছে আমার শরীরে।
আজ যখন আমি একা শুয়ে থাকি, তখন ভাবি— আমি কি চেয়েছিলাম? খুব বেশি কিছু?
একটু সময়। একটু যত্ন। একটু ভালোবাসা।
বিমানের টিকিট নয়, হীরের আংটি নয়। শুধু চেয়েছিলাম, দিনশেষে তুমি একবার জিজ্ঞেস করো, "তুমি কি খেয়েছো?" কিংবা "আজ কি খুব ব্যথা করছে?"
কিন্তু তুমি ব্যস্ত। তুমি ফ্লাইটে। তুমি আড্ডায়। তুমি অজুহাতে।
শোনো, এই লেখাটা তুমি পড়বে কি না জানি না। পড়লেও হয়তো তোমার সেই বিখ্যাত তাচ্ছিল্যের হাসি হাসবে। ভাববে, "আবার নাটক শুরু হয়েছে।" কিন্তু মনে রেখো, নাটকের শেষ দৃশ্যে কিন্তু সত্যটা বেরিয়ে আসে। আজ আমি হেরে গেছি, এটা সত্য। তোমার অবহেলার কাছে, তোমার ছলনার কাছে আমি পরাজিত। কিন্তু এই পরাজয় আমার লজ্জার নয়, তোমার।
কারণ, তুমি এমন একজনকে হারালে, যে তোমাকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি চেয়েছিল। আর আমি? আমি শুধু হারালাম এমন একজনকে, যে কোনোদিন আমার ছিলই না।
আমার ছয় মাসের বনবাস হয়তো কেটে যাবে। ওষুধে শরীর সেরে উঠবে। আমি আবার হাঁটবো। আবার গান শুনবো (হয়তো স্পটিফাই ছাড়াই)। কিন্তু তুমি? তুমি সারাজীবন ওই মিথ্যে খোলসটার ভেতরেই আটকে থাকবে। যেখানে বন্ধুদের ভিড় আছে, ফ্লাইটের টিকিট আছে, দামী উপহার আছে— কিন্তু একটা মানুষ নেই যে তোমার জন্য নিঃস্বার্থভাবে প্রাণ দিতে পারে।
আজ তোমাকে মুক্তি দিলাম। আমার অভিযোগ থেকে, আমার ভালোবাসা থেকে, আমার অপেক্ষা থেকে।
যাও, ওড়ো। আকাশ তো তোমার কেনাই আছে। শুধু মাটিতে তাকানোর দরকার নেই। কারণ এই মাটিতেই মিশে আছে আমার দীর্ঘশ্বাস, যা হয়তো কোনো একদিন কালবৈশাখী হয়ে তোমার ওই সাজানো আকাশে হানা দেবে।
তুমি নির্দোষ। তুমি মহান।
শুধু অপরাধী এই বোকা হৃৎপিণ্ডটা,
যে পাথরকে পূজো করেছিল দেবী ভেবে।
ভালো থেকো,
আমার একজীবনের দীর্ঘশ্বাস।
(অপ্রকাশিত জবানবন্দি)
আজ আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আমি আর নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চাই না। আমি শুধু চাই, তুমি একবার ওই জাজমেন্টের আসনে বসো। তোমার হাতে হাতুড়ি থাকুক। তুমিই রায় দাও। কিন্তু রায় দেওয়ার আগে, একবার শুধু চোখ বন্ধ করে ভাবো— তুমি কি সত্যিই মানুষ ছিলে? নাকি মানুষের চামড়া পরা কোনো এক যান্ত্রিক রোবট?
আমার শরীর যখন রক্তে ভাসছিল, পিচঢালা কালো রাস্তা যখন আমার লাল রক্তে ভিজে যাচ্ছিল, তখন তুমি কোথায় ছিলে? তোমার বন্ধুদের সাথে কফি শপে? নাকি কোনো শপিং মলে নতুন ড্রেস ট্রায়াল দিচ্ছিলে? আমি তো ফোন করেছিলাম। আমার কাঁপা কাঁপা গলায় বলেছিলাম, "একটু আসবে? খুব ভয় করছে।"
তোমার উত্তর ছিল, "এখন? এখন তো পসিবল না। আমি বিজি।"
বিজি! শব্দটা খুব ছোট। মাত্র দুটো অক্ষর। কিন্তু ওই দুটো অক্ষর যে আমার বুকে কত বড় একটা ক্ষত তৈরি করেছিল, তা কোনো সার্জারি দিয়ে ঠিক করা সম্ভব নয়। আমার মনে হয়েছিল, এর চেয়ে আমি যদি ওই রাস্তায় মরেই যেতাম, তবেই বোধহয় ভালো ছিল। অন্তত তোমার এই রূপটা দেখতে হতো না। তোমার এই "বিজি" থাকার অজুহাত শুনতে হতো না।
আচ্ছা, তুমি কি জানো, রক্তের একটা আলাদা গন্ধ আছে? একটা লোহা লোহা গন্ধ। হাসপাতালে শুয়ে আমি সেই গন্ধটা পাচ্ছিলাম। আর তার চেয়েও তীব্র গন্ধ পাচ্ছিলাম তোমার অবহেলার। নার্স যখন আমার ক্ষত পরিষ্কার করছিল, আমি ব্যথা পাইনি। আমি ব্যথা পেয়েছিলাম যখন ফোনটা চেক করে দেখলাম, তোমার একটা টেক্সটও নেই। একটা মিসড কলও নেই।
তুমি হয়তো ভাবছো, "এসব তো এক্সিডেন্ট। আমার কি দোষ?"
না, এক্সিডেন্টটা তোমার দোষ নয়। কিন্তু এক্সিডেন্টের পর তোমার উদাসীনতা? ওটা কি এক্সিডেন্ট? ওটা কি প্ল্যান করা নয়? তুমি কি জানো না, ভালোবাসলে মানুষ সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে চলে আসে? আর তুমি তো ছিলে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে। মনের দূরত্বটা যে আলোকবর্ষ সমান, সেটা সেদিন বুঝেছিলাম।
ডাক্তার বলেছেন, হরমোনাল ইমব্যালেন্স। স্ট্রেস। বিশ্রাম।
কিন্তু ডাক্তার কি জানেন, এই স্ট্রেসের নাম কি? এই ইমব্যালেন্সের উৎস কোথায়? আমার কর্টিসল লেভেল কেন হাই, সেটা কি কোনো টেস্ট রিপোর্টে আসবে? আসবে না। কারণ সেখানে লেখা নেই— "অতিরিক্ত অবহেলাজনিত রোগ"। সেখানে লেখা নেই— "ভালোবাসার কাঙালপনা সিনড্রোম"।
ছয় মাস। ১৮০ দিন। ৪৩২০ ঘণ্টা।
এই সময়টা আমি বিছানায় শুয়ে শুয়ে কি করেছি জানো? আমি হিসাব করেছি। টাকার হিসাব নয়। তোমার দেওয়া অপমানের হিসাব। তোমার মিথ্যে অজুহাতের হিসাব।
বলতে পারো, আমার স্পটিফাই পেমেন্টটা ক্যান্সেল করার সময় তোমার হাত কাঁপেনি কেন? মাত্র কয়েকশ টাকা। আমার জন্য গান শোনাটা ছিল একটা থেরাপি। তুমি জানতে। তুমি জানতে যে, আমি যখন ডিপ্রেশনে থাকি, তখন গানই আমার একমাত্র সঙ্গী। তুমি সেই সঙ্গীটাকেও কেড়ে নিলে। কেন? "টাকা সেভ করছি।"
অথচ, তার দুদিন পরেই ফেসবুকে দেখলাম, তুমি বন্ধুকে নিয়ে গোয়া যাওয়ার প্ল্যান করছো। ফ্লাইটের টিকিট স্পন্সর করছো। বাহ! কি দারুণ ইকোনমিক্স তোমার! প্রেমিকের ওষুধের চেয়ে বন্ধুর ভেকেশন বেশি জরুরি। প্রেমিকের মানসিক শান্তির চেয়ে নিজের সোশ্যাল স্ট্যাটাস বেশি দামী।
তোমার এই বিচারবুদ্ধি দেখে আমি সত্যিই হতবাক। তুমি কি আসলেই মানুষ? নাকি কোনো ক্যালকুলেটর? যেখানে ইনপুট দিলে আউটপুট আসে, কিন্তু কোনো ফিলিংস আসে না?
তুমি বলেছিলে— "ভালোবাসা মানে তো শুধু দেওয়া নয়, নেওয়াও।"
আমি দিয়েছি আমার আত্মসম্মান, আমার চোখের জল, আমার ঘুম।
বিনিময়ে কি নিয়েছি জানো?
একরাশ ঘৃণা, আর বুকভরা দীর্ঘশ্বাস।
তোমার দেওয়া এই "উপহার" আমি যত্ন করে রেখেছি,
আমার ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়া একাকীত্বে।
মাঝে মাঝে ভাবি, আমি কি খুব লোভী ছিলাম?
আমি তো তোমার বাবার সম্পত্তি চাইনি। আমি তো তোমার কাছে দামী গাড়ি চাইনি। আমি শুধু চেয়েছিলাম, দিনশেষে তুমি একবার বলো— "আমি আছি।" শুধু এই দুটো শব্দ। "আমি আছি।" এই শব্দদুটো কি খুব দামী? হীরের চেয়েও দামী?
হয়তো তোমার কাছে দামী। কারণ তুমি তো আমাকে কখনো আপন ভাবোনি। আমি ছিলাম তোমার অবসর সময়ের খেলনা। যখন বন্ধুদের আড্ডা শেষ, যখন নেটফ্লিক্সের সিরিজ শেষ, যখন আর কিছু করার নেই— তখন মনে পড়ত, "ওহ, একটা পাগল তো আছে, একটু নক করি।"
আর আমি? আমি সেই নক পাওয়ার জন্য চাতক পাখির মতো বসে থাকতাম। রাত বারোটা। একটা। দুটো। আমার চোখের নিচে কালশিটে পড়ে গেছে। আমার শরীর ভেঙে গেছে। কিন্তু আমি অপেক্ষায় ছিলাম। যদি তুমি আসো। যদি তুমি একবার ডাকো।
তুমি আসতে। কিন্তু ভালোবাসতে নয়। তুমি আসতে তোমার ইগো স্যাটিসফাই করতে। তুমি দেখতে চাইতে, আমি এখনো তোমার জন্য পাগল কি না। আমি এখনো তোমার জন্য কাঁদি কি না। আমার কান্না দেখে তুমি হয়তো মনে মনে হাসতে। ভাবতে, "কি বোকা ছেলেটা!"
হ্যাঁ, আমি বোকা। মহাবোকা।
না হলে জেনেবুঝেও কেউ বিষ পান করে? আমি করেছি। প্রতিদিন। প্রতি মুহূর্তে। তোমার দেওয়া অবহেলার বিষ আমি অমৃতের মতো পান করেছি। ভেবেছি, যদি ভালোবাসায় বিষক্ষয় হয়। কিন্তু হয়নি। উল্টো আমি নীলকণ্ঠ হয়েছি, কিন্তু দেবতা হতে পারিনি। হয়েছি শুধুই এক যন্ত্রণাকাতর মানুষ।
আজ আমার খুব ইচ্ছে করছে তোমাকে একটা প্রশ্ন করতে।
তুমি কি কখনো আয়নায় নিজের চোখের দিকে তাকিয়েছো?
সেখানে কি কোনো অপরাধবোধ দেখতে পাও? নাকি সেখানেও শুধুই কাজল আর মাসকারার প্রলেপ? আমার মনে হয়, তুমি নিজের চোখের দিকে তাকাতে ভয় পাও। কারণ তুমি জানো, সেখানে একটা খুনি লুকিয়ে আছে। যে আমাকে খুন করেনি, কিন্তু আমার ভেতরকার আমাকে খুন করেছে। যে আমার হাসিকে খুন করেছে। যে আমার বিশ্বাসকে খুন করেছে।
তুমি কি জানো, বিশ্বাস একবার ভাঙলে আর জোড়া লাগে না? যেমন ভাঙা কাঁচ। জোড়া লাগাতে গেলে হাত কেটে যায়। রক্ত পড়ে। আমার হাত কেটে গেছে, বুক কেটে গেছে। কিন্তু তুমি তো নির্ভিক। তুমি কাঁচের ওপর দিয়ে হেঁটে যাও, তোমার পায়ে রক্ত লাগে না। কারণ তোমার পা-ও হয়তো পাথরের।
পাথরকে কি দোষ দেওয়া যায়?
সে তো আঘাত করবেই।
দোষ তো আমার,
যে পাথরের বুকে ফুল ফোটাতে চেয়েছিল।
তুমি ভালো থেকো। খুব ভালো থেকো।
তোমার বন্ধুদের নিয়ে, তোমার ফ্লাইটের টিকিট নিয়ে, তোমার সাজানো মিথ্যে নিয়ে— তুমি সুখে থেকো। আমার অভিশাপ তোমাকে স্পর্শ করবে না। কারণ আমি তো তোমাকে ভালোবেসেছিলাম। আর ভালোবাসা কখনো অভিশাপ দেয় না। ভালোবাসা শুধু সরে যায়। নিশব্দে। ধীর পায়ে। যেমন করে আমি সরে যাচ্ছি।
আমার এই অসুস্থ শরীর হয়তো একদিন সুস্থ হবে। কিংবা হবে না। তাতে কার কি যায় আসে? পৃথিবী তো ঘুরছেই। তোমার ঘড়ির কাঁটাও ঘুরছে। শুধু আমার সময়টা থমকে গেছে সেই রাত বারোটায়।
তবে একটা কথা মনে রেখো।
একদিন— হয়তো অনেক বছর পর— কোনো এক মাঝরাতে, যখন তোমার চারপাশে কেউ থাকবে না, যখন বন্ধুদের আড্ডা ফুরিয়ে যাবে, যখন মেকআপ ধুয়ে যাবে— তখন হয়তো তোমার মনে পড়বে। মনে পড়বে এমন একজনকে, যে তোমার জন্য সব কিছু ছাড়তে রাজি ছিল। যে তোমার একটা মেসেজের জন্য রাত জাগত। যে তোমার অবহেলাকেও ভালোবাসা ভেবে বুকে জড়িয়ে ধরেছিল।
সেদিন হয়তো তুমি কাঁদবে। কিন্তু সেই কান্না আমাকে ফিরিয়ে আনবে না। সেই কান্না তোমার পাপ মুছবে না। সেই কান্না শুধু তোমাকে মনে করিয়ে দেবে— তুমি কি হারিয়েছো।
তখন বুঝবে, স্পটিফাই-এর সাবস্ক্রিপশন কেনা যায়, বিমানের টিকিট কেনা যায়, কিন্তু একটা বিশ্বস্ত হৃদয় কেনা যায় না। ওটা অর্জন করতে হয়। আর তুমি? তুমি সেটা অর্জন করার যোগ্যতা অনেক আগেই হারিয়েছো।
তাই আজ, এই শেষ চিঠিতে, আমি তোমাকে মুক্তি দিলাম।
যাও প্রিয়া, উড়ে যাও।তোমার ডানায় আর আমার দীর্ঘশ্বাস বাঁধবে না। তবে মনে রেখো, আকাশ যত বড়ই হোক, দিনশেষে সবাইকে মাটিতেই ফিরতে হয়। আর সেই মাটিতে যখন তুমি নামবে, দেখবে— সেখানে কেউ নেই। কেউ তোমার জন্য হাত বাড়িয়ে নেই।
তখন যদি খুব একা লাগে, তবে আকাশের দিকে তাকিও। দেখবে একটা তারা জ্বলছে। ওটা আমি নই। ওটা আমার ভালোবাসা, যা তুমি গ্রহণ করোনি, যা এখন মহাকাশে একা একা জ্বলছে। অনন্তকাল ধরে জ্বলবে। তোমাকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য যে— এখানে একজন ছিল, যে ভালোবাসতে জানত।
বিদায়।
না, শুভ বিদায় নয়।
কারণ শুভকামনা করার মতো মহত্ত্ব আমার নেই।
আছে শুধু এক বুক হাহাকার,
আর একরাশ করুণা— তোমার জন্য।
কাছে আসার স্পর্ধা যতটা দেখিয়েছি আজন্ম,
দূরে সরে যাওয়ার দম্ভ তার চেয়েও কয়েক গুণ বেশি রাখি।
তোমার ভালোবাসা যেমন দু'হাতে কুড়িয়েছি ভিখারির মতো,
আজ তোমার অবহেলাকেও রাজকীয় মর্যদায় গ্রহণ করলাম।
জেনো— যে ডুবতে জানে, সে ভাসতেও জানে।
পাথরের ভার বুকে নিয়ে হাঁটা আমার পুরনো অভ্যাস,
তাই আমাকে ভাঙার চেষ্টা করো না।
দিনশেষে এই আয়নায় আমি ছাড়া আর কেউ নেই,
এই একাকীত্বই আমার সাম্রাজ্য, আমার অহংকার।
তপ্ত দুপুরে রুদ্ধশ্বাসে প্রেমিক জ্বলে যায়!
তপ্ত বিকেলে প্রেমিকের শার্টের বোতাম খসে যায়।
তবে তপ্ত রাত গুলোয় আপনি আকাশ গোণেন কি করে?
আপনি জ্বলে যান না??
তুমি তো জানো না দহনের রঙ কি।
তুমি শুধু জানো এসি রুমে বসে
কফির কাপে চুমুক দিয়ে জানলার বাইরে বৃষ্টি দেখা।
অথচ আমার বুকের পাটাতনে রোজ চৈত্র মাসের খরা।
সেখানে আগুন জ্বলে, ফাটল ধরে, মাটি চৌচির হয়ে যায়।
তুমি সেই ফাটলে কোনোদিন জল ঢালোনি,
ঢেলেছো নুন, আর ছিটিয়ে দিয়েছো অবহেলার এসিড।
এই যে প্রেমিক জ্বলে যায়, পুড়ে ছাই হয়ে যায়—
সেই ছাই কি তোমার চোখে পড়ে না?
নাকি সেই ছাই দিয়েই তুমি চোখের কাজল পরো?
অদ্ভুত তোমার রুচি! অদ্ভুত তোমার বিলাসিতা!
মানুষের পোড়া গন্ধে তোমার উৎসব,
আর মানুষের দীর্ঘশ্বাসে তোমার গান।
রাতগুলো যখন অপার্থিব গরমে সেদ্ধ হয়,
যখন ঘুমানো যায় না,
যখন বালিশ ভিজে যায় ঘামে আর চোখের জলে—
তখন তুমি কি করো?
তুমি কি সত্যিই আকাশ গোড়ো?
নাকি তখনো ব্যস্ত থাকো নতুন কোনো অজুহাত বুনতে?
আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে,
তোমার ওই বরফ-শীতল হৃদয়ে কি কখনো আঁচ লাগে না?
নাকি তুমি এতটাই অগ্নিস্নাত যে,
অন্যের আগুন তোমাকে ছোঁয় না?
আমি তোমাকে কোনো অভিশাপ দিচ্ছি না। আমার কোনো ক্ষোভ নেই, কোনো ঘৃণা নেই। শুধু ঈশ্বরের কাছে—যিঁনি সব
দেখেন—একটাই নীরব প্রার্থনা রেখে গেলাম।
তিনি যেন তোমার জন্য এমন একজনকে পাঠান, যে হুবহু তোমারই প্রতিচ্ছবি। যে তোমার মতোই ভালোবাসার ভান
করবে, যে তোমার মতোই অজুহাতের পাহাড় গড়বে, যে তোমার মতোই অবহেলার কাঁটার মুকুটে তোমাকে সাজাবে। তুমি
তাকে ভালোবাসবে প্রাণ দিয়ে, আর সে তোমাকে উপহার দেবে শুধুই দীর্ঘশ্বাস। তুমি তার জন্য অপেক্ষায়
থাকবে রাত জাগা পাখি হয়ে, আর সে ব্যস্ত থাকবে অন্য কোথাও, অন্য কোনো আকাশে।
তখন, একমাত্র তখনই তুমি বুঝবে—প্রেমিকের বুকের বাঁশিতে যখন সুরের বদলে দীর্ঘশ্বাস বাজে, তখন তা কতটা
অসহ্য।
যদিও জানি, এই কলিকালে তেমন বিচার হয়তো হয় না... তবুও, প্রকৃতির নিজস্ব এক আয়না আছে, যেখানে একদিন
না একদিন, সবাইকে নিজের আসল মুখটা দেখতে হয়। সেই দিনটার জন্য তোলা রইল আমার এই একজীবনের সবটুকু
অভিমান।